আবদ্ধ শ্রেনীকক্ষ থেকে রাজপথে!

Share This Story !

তুহিন ফারাবী: ভয়াল ২৯ই জুলাই, ২০১৮ সাল! সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মাঝে অন্যতম ৫৬হাজার ৯৯৯ বর্গমাইলের অামাদের প্রাণের মাতৃভূমি বাংলাদেশ। বাঙালীর ইতিহাস,ঐতিহ্য,সংস্কৃতি অন্যান্য দেশের তুলনায় শতগুণ উর্ধ্বে।

৩০লক্ষ শহিদের রক্ত এবং ২লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অামাদের এই মাতৃভূমি। ৫২এর ভাষা অান্দোলন, ৫৬ এর শাসনতন্ত্র অান্দোলন, ৬২ এর শিক্ষা অান্দোলন, ৬৬এর ৬দফা অান্দোলন, ৬৯এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দীর্ঘ ৯মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মোকাবেলার মাধ্যমে অাজকের অর্জিত সোনার বাংলা।

অামরা নিজেদের গর্বের সাথে রফিক,শফিক, জব্বার এর অনুসারী দাবী করলেও কার্যত ক্ষেত্রে উনাদের প্রকৃত সম্মান অাজও অামরা দিতে ব্যর্থ। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, উনাদের স্বপ্নের বৈষম্য মুক্ত সোনার বাংলা অাজও অামরা গড়তে পারিনি।অামাদের ইতিহাস ঐতিহ্য যতটা গর্বের, অামাদের ব্যর্থতা গুলো ঠিক ততটাই লজ্জার।

২০১৮ সালের ২৯ই জুলাই, অাজকের এই দিনে ঘটে যায় বাংলাদেশের হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ঘটনা। যা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মানুষগুলো থেকে শুরু করে বিশ্বের মানুষকে কাঁদিয়েছিল।

এইদিনে ঢাকা বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া বাস চালকের বাস চাপায় পিষ্ট হয়ে যায় শহিদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজের দুই মেধাবী শিক্ষার্থী (রাজিব ও দিয়া) ঘটনাস্থলেই তারা নিহত হন।

তারই প্রতিবাদে ৩০ই জুলাই সারাদেশব্যপী নিরাপদ সড়কের দাবীতে “We Want Justice” প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে লাখো শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে অাসে।

সেই ছাত্র অান্দোলনের কিছু বিশেষ দিক সাধারণ মানুষের মনের গহীনে জায়গা করে নেয়।
যেমন:- বিচারপতির গাড়ির লাইসেন্স চেক করে লাইসেন্স না পেয়ে গাড়ির গ্লাসে লিখে দেয়া হয়, “লাইসেন্স বিহীন বিচারপতি।”

উল্টো দিকে চলা মন্ত্রীর গাড়ি অাঁটকে দিয়ে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়।
স্বাধীনতার ৪৭বছর পর এই প্রথম সড়কে ইমার্জেন্সী লেন তৈরী করা এবং এর সুবিধা কার্যকর করা।

প্রশাসন এর শতশত লাইসেন্স বিহীন গাড়ি গুলোতে সার্জেন্ট দ্বারা মামলা দেয়ার ব্যবস্থা করা।
রিক্সা/ভ্যানগাড়ীর জন্য ওয়ান লেন সার্ভিস চালু করা।

রাষ্ট্রের কল্যাণে স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছোটছোট শিক্ষার্থীরা এরকম শতশত যুগোপযোগী কার্যক্রম হাতে নিয়ে রাষ্ট্রটাকে নতুন একটি সূচনার মাধ্যমে অান্দোলন চলমান রেখেছিল।

অামরা দেখেছি এই অান্দোলনে কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক দলের পরিচয় অপব্যবহার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল এবং সঠিক তথ্য অান্তর্জাতিক গনমাধ্যমে প্রচারে সহযোগিতা করায় অান্তর্জাতিক অালোকচিত্রি ড.শহিদুল অালমকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। অান্দোলনের মুখে প্রায় ৪মাস পর উনাকে মুক্তি দেয়া হয়।

৪ই অাগস্ট অান্দোলনে কি ঘটেছিল? অামরা অনেকেই তা জানি, সাইন্সল্যাব স্পটে একজন অান্দোলনকারী হিসেবে অামি নিজে উপস্থিত ছিলাম।

নিহাল নামের স্কুল পড়ুয়া এক ছোটভাইয়ের চোখে লাঠি দিয়ে অাঘাত করার বিষয়টি নিজের স্বচক্ষে দেখা।

৫ই অাগস্টের কিছু কথা না বললেই নয়, অন্যান্য দিনের মত অহিংস অান্দোলন করেছিল স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।

৪ই অাগস্ট ছোটভাইদের উপর বিভিন্ন স্থানে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সাইন্সল্যাব অাসতেই পুলিশ ও সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়।

লণ্ডভণ্ড করে দেয় শান্তিপূর্ণ অান্দোলন।পুলিশ সন্ত্রাসীদের সাথে একত্রিত হয়ে টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট ছুঁড়তে থাকে অান্দোলনকারীদের উপর।

অামাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে ক্ষ্যান্ত হয়নি তারা, অনেককে লাঠিপেটা করে হসপিটালে পাঠিয়েছিল।
তখন এই স্পটে অাহত ও অসুস্থ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, ল্যাবএইড, গণস্বাস্থ্য সহ কয়েকটি বেসরকারী হসপিটাল।

অামাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলে অামরা ৪০/৫০জনের একটা টিম বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাংলা মোটর হয়ে শাহবাগের উদ্দেশ্যে যেতে চাইলে রূপায়ন সিটির পাশ থেকে পুলিশ অামাদের ধাওয়া করে, অাবারও ছোট ভাইদের উপর লাঠিপেটার ভয়ে স্কুল পড়ুয়া ছোটভাইদেরকে অাগলে রাখি অামরা কয়েকজন। তখনই পেছন থেকে পুলিশ অামাদের পিঠে ও শরীরের পেছন দিকটাতে লাঠিপেটা করতে থাকে।

ঐদিন বিকেলের দিকে ছোটভাইদেরকে বাসায় পাঠিয়ে অামরা ও বাসায় চলে অাসি।এর পর দিন ৬অাগস্ট।নিরাপদ সড়ক অান্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ইতিহাসের কালো দিন।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের পরামর্শে অামরা রামপুরায় ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে ৬ই অাগস্ট অবস্থান নিই মানববন্ধনের জন্য।
হঠাৎ করেই অাক্রমণ শুরু করে একদল হায়েনা, পুলিশ, লুঙ্গী পরিহিত একদল সন্ত্রাসী। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় অালোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

সন্ত্রাসী কতৃক ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ভাংচুর, পুলিশ কতৃক অহিংস শিক্ষার্থীদের উপর ক্যাম্পাসের ভেতর টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ, এ যেন ফিলিস্তিনে, ইজরায়েল এর হামলা।

সভ্য স্বাধীন দেশের অাইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এতটা তৎপর ভুমিকা রাখে, যা ইতিহাসে বিরল। সেদিন পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর ভুমিকা ছিল একচেটিয়া ।

দুপুরে অান্দোলন শেষে অামরা বাসায় ফেরার পথে ইস্টওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, ডেফোডিল এর ৫জন সহ অামাদেরকে গ্রেফতার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ।

অনেক নাটকীয়তার পর সন্ধ্যায় একজন রাজনীতিবিদের হস্তক্ষেপে ৫০হাজার টাকার বন্ড সই রেখে অামাদেরকে মুক্তি দেয় পুলিশ।

বাইরে এসে দেখি অনেক সাংবাদিক অামাদের মুক্তির জন্য চেষ্টা করেছিলেন।৭ই অাগস্ট প্রথম অালো সহ অনেক গণমাধ্যমের হেডলাইন হয়, বন্ড সই রেখে শিক্ষার্থীদের মুক্তি।

এ যেন হীরক রাজার দেশ। নিরাপদ সড়ক নিয়ে অনুভুতি শেষ করা যাবেনা। অামাদের ভালোবাসার এক অপর নাম নিরাপদ সড়ক অান্দোলন।

অনেক কিছু যেমন হারিয়েছি, তেমনই অনেকের ভালোবাসা পেয়েছি। গুনেধরা রাষ্ট্রকে ক্ষণিকের জন্য হলেও ঢেলে সাজিয়েছিল বাচ্চা গুলা। সর্বোপরি একটাই দাবী জানাই, প্রকৃত নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠিত হোক।

‌-মুহাম্মদ তুহিন ফারাবী, নিরাপদ সড়ক অান্দোলনকারী, শিক্ষার্থী, চাটার্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *