মহাবিশ্বের পরিনতি ও এনট্রপি

Share This Story !

এক মুহূর্তের জন্য ধরুন , মহাবিশ্বের গড় শক্তি ঘনত্ব সংকট মানের চাইতে কম !! শুধু ধরা না , মহাবিশ্বের পরিনতির অন্যতম একটি সম্ভাবনা এটি । মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ নির্ভর করে মহাবিশ্বে কি পরিমাণ পদার্থ রয়েছে এবং কত দ্রুত তা প্রসারিত হচ্ছে, তার উপর । মহাবিশ্বে সাধারণ উপাদান মাত্র ৫ শতাংশ । আর বাকী ৯৫ শতাংশ উপাদান হল ডার্ক এনার্জি এবং ডার্ক ম্যাটার । ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের বড় বড় স্থাপনা ছায়াপথ বা ছায়াপথগুচ্ছে আলাদা ভর যোগ করে যেমন এদের স্থায়িত্ব রক্ষা করছে তেমনি আবার মহাবিশ্বের প্রসারণের জন্য আবার ডার্ক এনার্জি দায়ী। আমরা সবাই জানি মহাকর্ষ বলের দ্বারা মহাবিশ্বের সবকিছু একে অপরকে আকর্ষণ করছে । আর এই আকর্ষণ বল আবার মহাবিশ্বের প্রসারণের বিপরিতে ক্রিয়া করে। যেহেতু মহাকর্ষ ভরের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত তাই মহাবিশ্বের প্রসারণ তথা মহাবিশ্বের পরিণতিও এই ভরের উপর নির্ভর করে।মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শেষমেশ থেমে গিয়ে, সংকোচন শুরু হওয়ার জন্য মহাজাগতিক ভর-ঘনত্বকে সর্বনিম্ন যে মানবিশিষ্ট হতে হবে এবং বিপরীতভাবে মহাবিশ্বের সংকোচন থেমে গিয়ে মহাবিশ্বের প্রসারণ শুরু হওয়ার জন্য মহাজাগতিক ভর-ঘনত্বকে সর্বোচ্চ যে মানবিশিষ্ট হতে হবে তাকে সংকট ঘনত্ব(critical density) বলা হয়।একে ρc দ্বারা সুচিত করা হয় ।

ফ্রিদমানের সমীকরণ অনুযায়ী,
ρc = 3H^2 / 8πG , এখানে H= হাবলের ধ্রূবক G = নিউটনের মহাকর্ষ ধ্রূবক । যেহেতু মহাবিশ্ব স্থির নয় তাই হাবলের ধ্রূবকের সঠিক মান এখন নিরুপন সম্ভব হয় নি । হাবলের ধ্রূবকের মান যত সঠিক হবে সংকট ঘনত্বের মানও তত সঠিক হবে।মহাবিশ্বের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের গড় মহাজাগতিক ভর-ঘনত্ব নিরূপণ করে এর সাথে সংকট ঘনত্বের অনুপাতের দ্বারা মহাবিশ্বের পরিণতি সম্পর্কে আমরা প্রথম লাইন সম্পর্কে পাই,যেহেতু স্থান-কালের বক্রতা এই শক্তি-ঘনত্বের উপর নির্ভরশীল, তাই মহাবিশ্বের গড় শক্তি ঘনত্ব সংকট মানের চাইতে কম হলে মহাবিশ্বের সবকিছু একে অন্যের আকর্ষণের নাগালের বাহিরে থাকবে । তখন আর কোন মহাকর্ষ না থাকায় মহাবিশ্ব অসীমহারে প্রসারিত হতে থাকবে যতক্ষণ না মহাবিশ্বের তাপমাত্রা পরম শূন্য তাপমাত্রায় নেমে আসে । মহাবিশ্বের শীতল মৃত্য ঘটবে।” এই শীতল মৃত্যুকে heath death বলে জানি । আর মহাবিশ্বের এনট্রপির কি হবে? ।এনট্রপি হলো পরিসংখ্যানিক বলবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাশি। কোন ভৌত ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিশৃঙ্খলার মাত্রাকে এনট্রপির সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। কোন প্রক্রিয়ায় (process) আগাগোড়াই যদি তাপীয় সাম্যাবস্থা সংরক্ষিত থাকে তাহলে সেখানে এনট্রপির মানও অপরিবর্তিত থাকে। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় স্বীকার্যে বলা হয়েছে যে, কোনো বিক্রিয়াতে (reaction) কখনোই মোট এনট্রপির মান হ্রাস পায় না। সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো এক সিস্টেমের বিশৃঙ্খলাই হচ্ছে এন্ট্রপি। অর্থাৎ, সহজ অর্থে এনট্রপির মান বাড়বে বৈকি কমবে না ।সহজ উদাহরনে ভাবা যাক, গরমের দিনে লেবুর শরবত বা ঠাণ্ডার দিনে চা বা কফি আমরা কে না খাই । শরবতে বা চায়ে চিনি গুলিয়ে নেওয়ার পরে কিন্তু সাধারন অর্থে আর চিনি আলাদা করা সম্ভব না । আপনি হয়ত কোন রসায়ন ল্যাবে গিয়ে পুনরায় পরিস্রুত করে দ্রবন থেকে চিনি আলাদা করে ভাববেন যে এনট্রপিকে তো উল্টা দিকে চালনা করা সম্ভব । কিন্তু বাস্তবে কিন্তু তা হবে না , কারন ইনভার্স এনট্রপি অর্জনের জন্য কিন্তু আপনি ঠিকই কাজ করে এনট্রপি বাড়িয়েছেন । গোলমেলে মনে হলে সিগারেটের কথা ভাবুন । সিগারেট খাওয়ার পরে কি সিগারেটকে আর আগের অবস্থায় ফেরত আনতে পারবেন ? দুনিয়ার সবচিতে বড় ল্যাবরেটরিতে গেলেও কিন্তু তাকে আর আগের রূপে ফিরিয়ে আনা আমাদের পক্ষে অসম্ভব । একইভাবে আমাদের মহাবিশ্বেও নক্ষত্ররা প্রতিনিয়ত শক্তি উৎপন্ন করছে, গ্রহরা নক্ষত্রদের প্রদক্ষিন করছে , ব্লাকহোলরা গিলছে । আর এতে এনট্রপি বৃদ্ধি পাচ্ছে তো পাচ্ছেই । তাই আমাদের মহাবিশ্বে সময়কে উল্টো দিকে চালনা করা কোনভাবেই সম্ভব না ! যদিও কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী বস্তুর তাবৎ কোয়ান্টাম তথ্য সংগ্রহ করলে তাকে তার আসল রূপ দেওয়া সম্ভব । তাই কোন বস্তুকে আগের রূপ দেওয়া গেলেও সময়কে উল্টা দিকে চালনা বা ইনভার্স এনট্রপি অর্জন কোনভাবেই সম্ভব না !!আমাদের মুল আলোচনা অনুযায়ী আমরা মহাবিশ্বের পরিনতি সম্পর্কে জানার জন্য এনট্রপির বিস্তারিত জেনে নিলাম । নক্ষত্রগুলি একসময় ব্লাকহোল আর ব্লাক ডোয়ার্ফে পরিণত হবে। কৃষ্ণ বামন বা ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ(Black Dwarf) হল তাত্ত্বিকভাবে নক্ষত্রদের জীবনচক্রের একদম শেষ পরিনতি। একে কৃষ্ণবিবর,বাদামি বা সাদা বামন নক্ষত্রদের সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না।আমরা জানি সব নক্ষত্র সুপারনোভা(supernova) বিস্ফোরণের মাধ্যমে ব্ল্যাকহোল বা নিউট্রন নক্ষত্রে পরিনত হয় না।সূর্যের মত মাঝারি ভর(সূর্যের ভরের ৯-১০ গুন বেশী ভরসম্পন্ন নক্ষত্র পর্যন্ত) তাদের হাইড্রোজেন জ্বালানী শেষ করে বহিঃস্থ গ্যাসীয় আবরন মহাশূন্যে নিঃসরণ করে সাদা বামন নক্ষত্রে পরিনত হয়। শ্বেত বামন নক্ষত্রদের মধ্যে যথেষ্ট জ্বালানী,তাপমাত্রা ও চাপ থাকে না ফিউশন বিক্রিয়ার জন্য। যে কারনে এই ধরনের নক্ষত্র তাপ বা আলো কিছু উৎপন্ন করতে পারে না।তবে এ ধরনের নক্ষত্র প্রচুর বিকিরণ নিঃসরণ করে এবং এরা তাপের সুপরিবাহী হওয়ায় খুব ধীরে এদের তাপমাত্রা হ্রাস পায়।আর হ্রাস পেতে পেতে একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছানোর কথা যখন নক্ষত্রের তাপমাত্রা মহাশূন্যের তাপমাত্রার সমান হবে। এ অবস্থায় এটিকে আর দেখা বা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। মহাবিশ্বের অন্ধকারে এটি হারিয়ে যাবে।সম্ভাব্য এ দশাকে কৃষ্ণ বামন নক্ষত্র বলা হয়। তবে মহাবিশ্বের বয়স অনুযায়ী এখনো কোন কৃষ্ণ বামন নক্ষত্রের জন্ম ঘটে নি।এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে শীতল শ্বেত বামন নক্ষত্রের তাপমাত্রা হল ৩৫০০ কেল্ভিন। যেটি শীতল হয়ে কৃষ্ণ বামন নক্ষত্রে পরিনত হত আরও কয়েক দশ বিলিয়ন বছর লেগে যাবে।মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৭ বিলিয়ন বছর।আর বেশীরভাগ সন্ধান পাওয়া শ্বেত বামন নক্ষত্রের বয়স ১২ বিলিয়ন বছরের কাছাকাছি।তাত্ত্বিক ভাবে ৫০০০ কেল্ভিন তাপমাত্রার শ্বেত বামন নক্ষত্র থেকে কৃষ্ণ বামন নক্ষত্রে পরিনত হতে ১০^১৫(১০ এর ঘাত ১৫) বছর সময় লাগবে।তাই বর্তমানে কোন কৃষ্ণবামন নক্ষত্রের অস্তিত্ব নেই।বর্তমান মডেল অনুযায়ী ১০^২৪ বছর পরে কোন নক্ষত্রের অভ্যন্তরে আর নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটবে না । অর্থাৎ, প্রতিটা নক্ষত্র মারা যাবে।মহাবিশ্ব পরিনত হবে নক্ষত্রদের কবরস্থানে। থাকবে শুধু অসীম অন্ধকার আর নক্ষত্রদের প্রেতাত্মা !!গ্রান্ড ইউনিফিকেশন থিউরি অনুযায়ী ১০^৩২ বছর পরে মহাবিশ্বের সমস্ত প্রোটন ও নিউট্রন শক্তি বিকিরন করে নিঃশেষ হবে , অর্থাৎ প্রোটন, নিউট্রন বলে কিছু থাকবে না । যার অর্থ, আমরা যেমন মহাবিশ্ব দেখতে অভ্যস্ত তেমন আর থাকবে না । গ্রহ , নক্ষত্র , নিহারিকা, ছায়াপথ কিছু থাকবে না ।যার অর্থ পারতপক্ষে আর কোন প্রক্রিয়াও খুব একটা চলবে না । ১ মিনিট দাঁড়ান , তখনও আরেক যোগীর মরা বাকীই থাকবে । ব্লাকহোল , কিন্তু স্টিফেন হকিং দেখিএছেন , ব্লাকহোল থেকে কিছু মুখতি পায় না ভুল । এর থেকে এক ধরনের বিকিরন নিঃসৃত হয় যাকে হকিং বিকিরন বলে । হকিং বিকিরণের ব্যাখ্যা দেয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা অনুযায়ী শূন্যস্থান আসলে শূন্য না। সে শূন্যস্থানে অবিরত ভার্চুয়াল কণা নামের কণিকারা জোড়ায় জোড়ায় উৎপন্ন হচ্ছে। এই জোড়ার মধ্যে একটি বাস্তব কণা, অন্যটি প্রতিকণা। এই কণা প্রতিকণা উৎপন্ন হবার পর এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মত ক্ষুদ্র সময়েই এরা একটা আরেকটার সাথে মিলে নিঃশেষ হয়ে যায়। সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথেই বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু যখন এই ভার্চুয়াল কণারা কৃষ্ণ বিবরের ঘটনা দিগন্তের কাছে সৃষ্টি হয় তখন কৃষ্ণ বিবর এই কণাদের প্রভাবিত করে। কৃষ্ণ বিবর কর্তৃক প্রযুক্ত শক্তির প্রভাবে এই কণাযুগল আর একে অপরের সাথে মিলিত হয়না। দুটি কণার একটিকে নিজের দিকে টেনে নেয় আরেকটিকে বাইরে ঠেলে দেয়। কণাটির বাইরে চলে আসতে যে শক্তির দরকার হয় তা সরবারহ করে কৃষ্ণ বিবর নিজে।এভাবে ১০^১০০ বছর পরে ব্লাকহোলেরাও তাদের সমস্ত ভর হারিয়ে ফেলবে । কোন ব্লাকহোল থাকবে না । এসময় মহাবিশ্বের তাপমাত্রা পরম শূন্যের অতিব নিকটে নেমে আসবে । আর একসময় কোন প্রক্রিয়াও আর সংগঠিত হবে না । মানে আর কোন এনট্রপিও বাড়বে না । অর্থাৎ মহাবিশ্বের শুধু তাপগত মৃত্যুও ঘটবে না , এনট্রপিজনিত entropy deathও ঘটবে । তবে মহাবিশ্বের পরিনতি আমরা চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি না । এটি গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক অনুমান । কেবল আমাদের বর্তমান পদার্থবিদ্যা অনুযায়ী সম্ভাব্যতা যাচায় । কে যানে , হয়ত আজ থেকে কিছু বছর পরে পদার্থবিদ্যার অখণ্ড নীতিগুলোই খণ্ডিত হবে ।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *