বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-১

Share This Story !

স্টার বার্তার সকল বন্ধুরা , সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা । আশা করি সবাই ভাল আছেন । আজ আমি একটা ব্যাতিক্রম ধর্মী বিষয়ের অবতারণা করব আপনাদের সামনে । আসলে আমাদের এখানে বিজ্ঞান এর বিভিন্ন আবিষ্কার সম্পর্কে আপডেট হয় , তবে বেশীর ভাগই হয় প্রযুক্তির বিষয়ে । মনে হয় স্টার বার্তার ‍বিজ্ঞান সাইট আজ ভুলতে বসেছে যে কম্পিউটারের বাইরেও অনেক কিছু মানুষের জানা দরকার । আজ আমি সেরকমই একটা বিষয় নিয়ে লিখতে যাচ্ছি আমাদের স্টার বার্তায়। আজ থেকে আমি ধারাবাহিক ভাবে বিজ্ঞানের বিভিন্ন লেটেস্ট আবিষ্কার , থিওরী প্রভৃতি সম্পর্কে লেখা শুরু করব । আমার আজকের বিষয় হল ” স্ট্রিং থিওরি ” ।

এখানে এমন অনেকে আছেন যারা এই নামটা আজই প্রথম শুনলেন ও শুনে অবাক হচ্ছেন । আসলে এটা হল মহাবিশ্বের প্রাথমিক সবকিছুর উৎপত্তি নিয়ে একটা থিওরী । যেটা একট বিশেষ কারণে সৃষ্ট হয়েছিল । ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই । তবে আপনি যদি বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে থাকেন তবে আশা করি একটু ভাল বুঝতে পারবেন ।

স্ট্রিং থিওরী কী???

এটা হল একটা তত্ত্ব যার প্রবক্তা জন শোয়ার্জ ও এডওয়ার্ড উইটেন । মহাবিশ্বের সবকিছুই স্ট্রিং নামক এক ধরণের অতি ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত । এইটাই হল স্ট্রিং থিওরীর মূল কথা । এখন কীভাবে গঠিত , কেন গঠিত এসবগুলোই হল আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় ।

কেন এর আবির্ভাব

এই থিওরী মূলত আভির্কাভ হয় একটা কারণে । সেটা হল মহাবিশ্বের শেকর বিশ্লেষণ । আর এর আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট অনেক বড় । আমি সংক্ষেপে একটু আলোচনা করলাম । পদার্থবিদ্যার চারটি মৌলিক বলের কথা আমরা নিশ্চই জানি । সেগুলো হল :

  • ১. মহাকর্ষ বল
  • ২.সবল নিউক্লিয় বল
  • ৩.দূর্বল নিউক্লিয় বল
  • ৪.তড়িৎ চুম্বকীয় বল

এখন তাত্বিক পদার্থবিদ্যার মূল কাজ হল এই বল গুলোকে একীভূত করা বা এক সুতোয় গাথা । আইনস্টাইন এই কাজ শুরু করেছিলেন , কিন্তু শেষ করতে পারেন নি । পরবর্তীতে এসে গ্লাসো , সালাম ও ভাইনবার্গ মিলে তড়িৎ চুম্বকীয় বল , আর দূর্বল নিউক্লিয় বলকে এক সুতোয় গাথতে সক্ষম হন । কিন্তু সব গুলোকে এক সুতোয় গাথা তখনও সম্ভব হয় নি । পরবর্তীতে কোয়ান্টাম তত্বের দ্বারা মহাকর্ষ বল বাদে অন্য সব বলকে এক সুতোয় গাথা সম্ভব হল ।আর এই মহাকর্ষবলকে এর সাথে গাথতে যে থিওরী আসল তা হল “আপেক্ষিকতার ব্যাপক তত্ত্ব” । কিন্তু বিরোধ দেখা দিল অন্য স্থানে । তখন কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও আপেক্ষিকতার ব্যাপক তত্ত্ব নিয়ে গোল বাধল ।এদের পরস্পরের মধ্যে দেখা দিল বিরোধ । আপেক্ষিকতার ব্যাপক তত্ত্ব দিয়ে মহাবিশ্বের সবকিছুই ব্যাখ্যা করা যায় , আবার কোয়ান্টম থিওরী দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায় । তবে , উভয়ের ক্ষেত্র ছিল আলাদা । যেমন , আপেক্ষিকতার ব্যাপক তত্ত্ব বৃহৎ স্থানে , যেমন : গ্রহ, তারকামন্ডল , নীহারিকার বিচলন এমনী মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ প্রভৃতি এর মাধ্যমে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যেত । আবার কোয়ান্টাম থিওরী দিয়ে আনবিক ও পারমানবিক স্তরের বিভিন্ন তত্ত্ব সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় । এদের প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল । কিন্তু ভাবছেন , তাহলে কেন এদের মধ্যে বিরোধ ? বিজ্ঞানীরা ভাবলেন , এইভাবে মহাবিশ্বের দুই রকম জগৎকে দুটি থিওরী দেয় ব্যাখ্যা করা যেন পদার্থবিজ্ঞানেরই ব্যার্থতা । যে সময় না পর্যন্ত এই দুই থওরীকে এক সুতোয় গাথা যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত মহাবিশ্বের সবকিছু সঠিকভাবে আমাদের জানা সম্ভব হবে না । আর কিছু ক্ষেত্রে এই দুটি থিওরী দিয়ে কোন কিছু ব্যখ্যা করতে গেলে সমস্যার সৃষ্টি হয় । যেমন, কৃষ্ঞ গহ্বরের ক্ষেত্রে । এ ক্ষেত্রে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে আমরা জানি যে কৃষ্ঞগহ্বরে বস্তুসমূহ অত্যান্ত ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে তার কেন্দ্রে একটি ক্ষুদ্র বিন্দুতে বিলীন হয় । এক্ষেত্রে আমরা দেখছি, কৃষ্ঞগহ্বর একই সাথে অত্যান্ত উচ্চ ভর বিশিষ্ট ও অত্যান্ত ক্ষুদ্র আয়তনবিশিষ্ট একটা বস্তু । এখন , এই কৃষ্ঞগহ্বর ব্যাখ্যা করতে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব লাগছে বৃহৎ ভরের কারণে সৃষ্ট মহাকর্ষ কেন্দ্রকে সামলাতে , আবার কোয়ান্টম তত্ত্ব লাগছে কৃষ্ঞগহ্বরের অত্যান্ত ঘন সন্নিবিষ্ট ক্ষুদ্রায়তনের কারণ ব্যাখ্যার জন্য । আর এই দুই তত্ত্ব একসাথে প্রয়োগ করতে গিয়ে দেখা যায় যে এই বিশেষ অবস্থায় তারা ভেঙে পড়ে ।যেমন ভাবে কোন শক্ত মাটির দলাকে চাপ দিলে ভেঙে পড়ে তেমন ভাবেই । আর মহাবিশ্বের শুরুতে , অর্থাৎ বিগ ব্যাং এর আহে মহাবিশ্বের অবস্থা এই কৃষ্ঞগহ্বরের মতই ছিল । আর এই অবস্থকে এই ২ থিওরী দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গেলে একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে । তারা এক সময় ভেঙে পড়ছে । এমন আরও অনেক ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব ব্যার্থ । আর এসব কারণেই এদের মধ্যে একটা মিলনের দরকার ।

স্ট্রিং থিওরী বিস্তারিত

আসলে এই থিওরী এখনও পর্যন্ত শুধু অংক কষে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছ । এর বাস্তব প্রমাণ হাজির করা সম্ভব হয় নি । কারণটা একটু পরেই ব্যাখ্যা করছি । আমরা জানি , সকল পদার্থই ক্ষুদ্র কণার সমষ্টি । কয়েক বছর আগেও আমরা ইলেকট্রোন , প্রোটন , নিউট্রন ও আরও কিছু কণিকাকে মৌলিক কণিকা বলে জানতাম ।তারপর প্রমাণিত গয় , একমাত্র মৌলিক কণিকা হল কোয়ার্ক ও ইলেকট্রন । প্রোটন , নিউট্রনসহ অন্যান্য কলিকা গুলো কোয়ার্ক থেকে সৃষ্ট । কিন্তু এখন আর তা নেই ।এখন স্ট্রিং থিওরী অনুযায়ী এইসব কণিকা গুলোকে ভাংলে পাওয়া যাবে স্ট্রিং । এর দৈর্ঘ হল ১০-৩৩ সে.মি ।অর্থাৎ প্লাঙ্কের স্কেলের সমান । বুঝতেই পারছেন , কেন এই স্ট্রিং থিওরী হাতে কলমে প্রমাণ করা এখন সম্ভব নয় । কারণ এই অত ক্ষুদ্র স্ট্রিং কে দেখতে হলে আমাদের প্রযুক্তি অনেক উন্নত হতে হবে । এই থিওরী অনুযায়ী কোয়ার্ক ও ইলেকট্রন হল স্ট্রিং দ্বারা সৃষ্ট । নিচের চিত্রটি খেযাল করুন :

এ স্ট্রিং একরকম সুতো বা তন্তুর মত । এর ধর্ম হল কাপা বা কম্পিত হওয়া । এর বিভিন্ন রকম কম্পন বিন্যাসের কারণেই সৃষ্টি হয় বিভিন্ন কণিকা । যেমন, এটি একরকম ভাবে বিন্যস্ত হলে ইলেকট্রন সৃষ্টি হয় , আরেকরকম বিন্যাসের কারণে সৃষ্টি হয় কোয়ার্কের । আর এই বিন্যাসের জন্য আঠা হিসেবে কাজ করে এই চারটি মৌলিক বল । অর্থাৎ, আমরা যেসব মৌলিক কণিকার কথা জানি , তারা আসলে এই স্ট্রিং এর বিভিন্ন মাত্রা ও বিন্যাসের কম্পন ছাড়া আর কিছুই নয় । নিচের চিত্র টা দেখুন । বিষয়টা ক্লিয়ার হবে ।

আর এই তত্ত্ব এর মাধ্যমে চারটি বলকে একই সুতোয় গাথা সম্ভব হল । কারণ , আমরা জানি মহাকর্ষ বলের জন্য দায়ী গ্রাভিটন নামক কণা । এরকম প্রত্যেক বলের জন্যই এক ধরণের কণা দায়ী , যেমন তড়িৎ চুম্বকীয় বলের জন্য ফোটন ।এখন স্ট্রিং তত্ত্ব আমাদের বলছে যে গ্রাভিটন হল প্লাঙ্কের দৈর্ঘের কম্পনশীল একধরণের কণা । এখন আমরা জানি যে গ্রাভিটন কণাই হল মহাবিশ্বক্ষেত্রের সবথেকে ক্ষুদ্র কণা ।

এখন গোল বাধল আরেক স্থানে । এই তত্ত্ব অনুয়ায়ী অংক কষে দেখা গেছে যে মহাবিশ্ব চর্তুমাত্রিক নয় । মহাবিশ্বে মাত্রা রয়েছে ১০ টি । তা কী ভাবে সম্ভব ? বিজ্ঞানীরা এখনও আমাদের দৃশ্যমান ৪ মাত্রা বাদে অন্য মাত্রা গুলো যে কেমন হতে পারে তা কল্পনাও করতে পারেন নি । তবে এগুলো কেন আমরা দেখতে পাই না তা এই স্ট্রিং তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে । কারণ , দেখুন , অনেক সময় একটা সুতো কে যদি খুব দ্রুত কম্পিত করা হয় তবে আমরা সেটিকে ভাল দেখতে পাইনা , বা ভাল বুঝতে পারি না যে সেটা কী । বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোন দড়িকে আমরা দূর থেকে দেখতে পাই না । জাদুকরেরা এই দড়ি নিয়ে অনেক খেলা দেখান , যেখানে দর্শক দড়ি দেখতে না পেয়ে তাকে সত্যিকারের জাদু মনে করে । তা , সেইরকম ভাবে , এই বাদবাকী মাত্রাগুঅেও সেরকম । মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় ওই মাত্রাগুলোর অন্যরকম বিন্যাসের কারণে আমরা তাদের দেখতে পাই না । হয়ত মহাবিশাব সৃষ্টির সময় সেগুলো কোকরানো অবস্থায় থেকে গেছে , ফলে বিস্তারিত হতে পারেনি । আর যেগুলো বিস্তার লাভ করেছে , সেগুলোই আমরা দেখতে পাই বা অনুভব করতে পারি ।

এসবের বাইরেও স্ট্রিং থিওরীর অনেক আলোচনা আছে যা এখানে বললে সবাই বুঝবে না । আাম এখাসে জাস্ট বিষয়টা সহজ সরল ভাষায় বলতে চেষ্টা করেছি যাতে সবাই এটা বুঝতে পারে । এই হল স্ট্রিং থিওরীর অ আ ক খ । আগামী পর্বে মাল্টিভার্স থিওরী নিয়ে বলব বলে আশা করছি ।

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-২

About The Author

Related posts

৪ Comments

  1. Pingback: বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-২ – Star Barta

  2. Pingback: বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-৩ – Star Barta

  3. Pingback: বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-৪ – Star Barta

  4. Pingback: বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-৫ – Star Barta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *