বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-২

Share This Story !

প্রিয় স্টারবার্তা বন্ধুরা, আশা করি সবাই ভাল আছেন । আজ আমি বিজ্ঞানের মহাজগৎ এর ২য় পর্ব লিখতে চলেছি । আশা করি সবাই এটি উপোভোগ করবেন । আমার আজকের বিষয়টা হল মাল্টিভার্স তত্ত্ব ও এর সাথে সম্পর্কিত সব বিষয়গুলো ।

মাল্টিভার্স কী

এই মাল্টিভার্স তত্ত্বের জনক হলেন এ্যলেন গুথ নামক এক ভদ্রলোক । তবে সর্বপ্রথম এই ধরণের একটা ধারণা করেন বিজ্ঞানী জিওনার্দো ব্রুনো । তাকে কোর্পানিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব তত্ত্ব সাপোর্ট করার জন্য পুড়িয়ে মারা হয় ।

মাল্টিভার্স হল এমন একটি ধারণা যেখানে মনে করা হয় যে , আমাদের এই বিশ্ব ব্রম্মান্ডে মহাবিশ্ব একটি নয় । মহাবিশ্ব অনেক অনেক এবং অনেক । আমরা সবাই মনে হয় বিগ ব্যাং সম্পর্কে কম বেশী জানি । বিগ ব্যাং তত্ত্ব মতে স্থান কাল সবকিছুর সূচনা হয় একটি মহা বিষ্ফোরণের মাধ্যমে । সৃষ্টির শুরুতে এই মহাবিশ্বের সবকিছু একসাথে জমাট বেধে ছিল । এই মহা বিষ্ফোরণের ফলে সবকিছু আলাদা হয় পরস্পর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে এবং এই দূরে সরে যাওয়া আজও থামেনি । মহাবিশ্ব এখনও সম্প্রসারণশীল । এই তত্ত্বকে সম্প্রসারণ তত্ত্ব ও বলা হয় । এখন এই মহাবিশ্বের সবকিছু সৃষ্টির আদিতে এমন ভাবে বিষ্ফোরণ ঘটে , ঠিক একটা সাবানের বুব্দুদ ফাটলে যেমন হয় , তেমন ভাবে । একটি সাবানের বুবুব্দ আস্তে আস্তে প্রসারেত হয়ে হঠাৎ করে ফেটে যা সৃষ্টি করল , তাই আজকের মহাবিশ্ব ।

এখন আমরা আসি মাল্টিভার্সে । বিগব্যাং তত্ত্বই বহু দিন ধরে এই পৃথিবীতে রাজ করে আসছিল । আর এখনও করছে । তবে এই তত্ত্ব থেকে আরেক ডিগ্রি উপরে আরেক তত্ত্ব আবিষ্কার হয়েছে , আর সেটা হল ” মাল্টিভার্স তত্ত্ব ” । এটা বিগ ব্যাং কে নাকচ করে দেয়নি মোটেও , বরং এর ভিত আরও মজবুত করেছে ।

মাল্টিভার্স তত্ত্ব এর ব্যাখ্যা

বিগব্যাং আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানী অ্যালেন গুথ চিন্তা করে দেখলেন , আমাদের এই মহাবিশ্ব যেমন ভাবে মহাবিষ্ফোরণের মাধ্যমে স্থান কাল শূন্যতার ভিতর দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে , তাহলে এই প্রক্রিয়া তো একাধিক বার ঘটতে পারে । আর মজার কথা হল , বাস্তবে ঘটছেও তাই । মূলত মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় মহাবিষ্ফোরণের পর সাবানের বুদবুদের মত অসংখ্য মহাবিশ্ব আজও তৈরী হয়ে চলেছে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে । ফলে প্রতি নিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে অসংখ্য মহাবিশ্ব । আর এ প্রত্যেকটা মহাবিশ্ব নিজেদের থেকে পর পর দূরে সরে যাচ্ছে । আর এ ধরণের অসংখ্য মহাবিশ্বের একটিতে আমরা অবস্থান করছি অন্যটা সম্পর্কে জ্ঞাত না হয়ে ।মূলত মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় মহাবিষ্ফোরণের পর সাবানের বুদবুরদর মত অসংখ্য মহাবিশ্ব আজও তৈরী হয়ে চলেছে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে । নিচের চিত্র টা দেখ মাল্টিভার্স সম্পর্কে আপনাদের ধারণা আরও ভাল হবে ।

পকেট মহাবিশ্ব

এখন এই মাল্টিভার্সের থেকে বেরিয়ে এসেছে পকেট মহাবিশ্বের ধারণা । পকেট মহাবিশ্ব হল একটা মহাবিশ্ব থেকে আরেকটার সৃষ্টি । ভাবছেন , এটা আবার কেমন । হ্যা । বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্ব নিয়ে গবেষনা করতে গিয়ে দেখলেন যে , আসলে , সৃষ্টির উষালগ্নে বিগ ব্যাং ঘটার পরে , উৎপন্ন বুদ বুদ গুলো আবার ও বিষ্ফোরিত হল , এখন এই বুদ বুদ গুলোর বিষ্ফোরণের ফলে আবারও সেই মহাবিশ্ব গুলো থেকে উৎপন্ন হল নতুন এক মহাবিশ্ব । এ্‌ই প্রক্রিয়া বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকল ও উৎপন্ন হতে থাকল অসংখ্য পকেট মহাবিশ্বের । আমরা হয়ত এমনই একটা পকেট মহাবিশ্বে আছি । নিচের ছবিটা লক্ষ্য করুন । তাহলে পকেট মহাবিশ্বের ধারণাটা আরও ক্লিয়ার হবে ।

মূলত বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখলেন যে , আইনস্টাইনের সূত্র থেকে স্থান ও কালকে কেবল বাকানো বা সম্প্রসারিত করাই যাচ্ছে না , ইচ্ছে মত ভেঙে ফেলাও যাচ্ছে । আর এই ধারণা থেকেই পকেট মহাবিশ্বের ধারণার উৎপত্তি । তবে পকেট মহাবিশ্ব গুরো যখন উৎপন্ন হয় তখন তাদের সাথে তাদের মাদার মহাবিশ্বের কোন সম্পর্ক থাকে না । মানে তার মাদার মহাবিশ্বের কোন বৈশিষ্ঠ যে চাইল্ড মহাবিশ্বে থাকবে এমন কোন কথা নেই । মূলত এই পকেট মহাবিশ্ব তৈরী হওয়ার কাহিনী টা নিচের চিত্র টা দেখলে আশা করি বুঝতে পারবেন ।

ADs by Techtunes ADs

প্যারালাল ইউনিভার্স

এই মাল্টিভার্সের আরেকটি উপজাত হল এই প্যারালাল ইউনিভার্স তত্ত্ব । এই আপনাদের একটু সহজ ভাষায় ব্যাখ্য করি । খেুন , প্রত্যেক কণারই একটা প্রতিকণা বা বিপরীত ধর্মী কণা আছে । যেমন, ইলেকট্রনের প্রতি কণা হল প্রোটন । এইভাবে , পরমাণুর ভিতর এই পযন্ত যতগুলো কণা পাওয়া গেছে , তার প্রতি কণাও পাওয়া গেছে । এখন এই মাল্টিভার্স থিওরী অনুযায়ী , এই বিশাল বিশ্ব ব্রম্মান্ডে আমরা যদি পজেটিভ হই , তবে আমাদের নিশ্চই নেগেটিভ কোন কিছু আছে । বা আমরা যদি নেগেটিভ হই , তাহলে নিশ্চই আমাদের কোন পজেটিভ কিছু আছে । আর এই তত্ত্ব তখনই কার্যকর হবে যখন এই মাল্টিভার্স সত্য হবে । একইভাবে , আমাদের এই মহাবিশ্বেরও একটা পজেটিভ বা নেগেটিভ মহাবিশ্ব আছে । আর এই ধারণাটাই হল প্যারালাল মহাবিশ্বের ধারণা । হয়ত সেই মহাবিশ্বে আপনি যখন আমার এই লেখা পড়ছেন , আপনার একটা প্রতি মানুষ ঠিক এমন ভাবে বসে আমার এই লেখা পড়ছে । অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কাজই সেখানে ঘটে চলেছে ঠিক টাইমিং করে । কী , আজব না ? নিচের চিত্র টা দেখুন । বিষয় টা আরও ক্লিয়ার হবে ।

মানুষের জন্ম মৃত্যু

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় আমাদের মহাবিশ্বে যখন একটা বস্তুর জন্ম হচ্ছে তখন প্যারালাল মহাবিশ্বে সেই বস্তুটির কী ঘটছে। ধরে নিলাম তার সেখানে তার প্রতি-বস্তুর জন্ম হচ্ছে। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু অন্যমাত্রার অন্য মহাবিশ্বগুলোতে কী ঘটছে? এখানেই কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলছে, যদি আমাদের চারমাত্রিক জগতের জন্ম বা মৃত্যুর কথা হিসাব করি তবে তবে অন্যমাত্রার অন্য মহাবিশ্বগুলোতে একই হিসাব খাটবে না । ধরা যাক, আমাদের মহাবিশ্ব (একই সাথে প্যারালাল মহবিশ্বে) কেউ মৃ্ত্যুবরণ করছে তাহলে আমাদের মহাগতের জন্য এই মৃত্যু নির্দিষ্ট ঘটনা। তাহলে অন্য আরেকটি মহাবিশ্বগুলোর জন্য এই মৃত্যু কোয়ান্টামের ভাষায় নির্দিষ্ট নয়। তখন এরটা হিসেব করতে গেলে অসীম কোনো মানে চলে যাবে। তেমনি অন্য আরেকটি মহাবিশ্বে যদি ওই বস্তুটার মৃত্যুঘটে তবে আমাদের মহাবিশ্বের এই মৃত্যুর হিসাব আসবে অসীম । অর্থাৎ জীবিতও আসতে পারে । এই বিষয় নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন তত্ত্ব। এর নাম ‘বায়োসেন্ট্রিজম’ (biocentrism) তত্ত্ব। সহজ হিসাব যেহেতু মহাবিশ্বের সংখ্যা অসীম সুতরাং জীবন-মৃত্যুর সংখ্যাও অসীম। কোথাও হয়ত সে মৃত। অন্য অসংখ্য মহাবিশ্বে তার জীবিত অবস্থা বিদ্যমান । মানুষের দেহে জীবিত অবস্থায় যে শক্তি থাকে তা মৃত্যুর পরে কোথায় যায় ?এই শক্তি কি মৃত্যুর সময় বিলুপ্ত হয়ে যায়? মোটেই নয়! নতুন এই তত্ত্ব বলছে, এই শক্তি এক মহবিশ্ব থেকে আরেক মহাবিশ্বে সঞ্চালন হয়। আর এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় ভিত্তি শক্তির নিত্যতা সূত্র । এই সুত্র মতে সূত্রের অবিনশ্বর । তাহলে মস্তিষ্কের ওই শক্তি ঝর্না মৃত্যুর পরে কোথায় যায়?

অসীম কালে ও স্থানে মৃত্যুই শেষ কথা হতে পারে না। আইনস্টানের উদ্ধৃতি থেকে বলা বলা যায়, সময় অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মধ্যে পার্থক্য শুধু একগুঁয়ে বিভ্রমের। সময়ের বাইরে হিসাব করলে বা অসীম সময়ে হিসাব করলে মানুষের জীবন-মৃ্ত্যুর ফলাফল দাঁড়ায় সে জীবিত অথবা মৃত। অসীম মহবিশ্বের হিসাবে তুচ্ছাতিতুচ্ছ এক মানুষের জীবন-মৃত্যুর হিসাব অতি গৌণ। তবু মৃত্যুই শেস কথা নয়। এই মৃতের যে শক্তিটুকু ছিল তা হয়তো আরেকটা কোনো মহাবিশ্বে জীবন হিসেবে বিকশিত হচ্ছে ।

মাল্টিভার্সের প্রমাণ

মাল্টিভার্সে কোন মজবুত প্রমাণ এখনও পর্যন্ত হাজির করা সম্ভব হয় নি । তবে পদার্থ বিদ্যার সকল সূত্র এই তত্ত্ব সমর্থন করে ।আর এই সম্পর্কে একটা ঘটনা না বললেই নয় । সেটা হল , এ্যলেন গুথ এই থিওরী আবিষ্কার করার পর এক সাংবাদেক তাকে প্রশ্ন করে বসলেন , মহাবিশ্ব যদি বুদ বুদের মত সৃষ্টি হয়ে প্রসারেত হয় , তবে তাদের মধ্যে তো সংঘর্ষ ঘটার সম্ভাবনা আছে । এমন কি এর ফলে কোন মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যেতেও পারে । তা বিষয় টা ভাবনার বিষয় । তখন , ইংল্যান্ডের এক বিজ্ঞানী গবেষণা শুর করলেন এই নিয়ে । তারা জানতেন , এই ধরনের পর্যবেক্ষণ এরর একমাত্র রিসোর্স হল নাসার WMAP(উইলকিনসন মাইক্রোওয়েভ এনিসোট্রবি প্রোব) ডাটা । এই ডাটা হল মহাবিশ্বের বিভিন্ন ঘটনার পটভূমি ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত হয় । মহাবিষ্ফোরণের পর মহাবিশ্ব যে আস্তে আস্তে শীতল হলে ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াসে গিয়েছিল , তা এই ডাটা থেকেই বের করা হয়েছিল । তারা এই ডাটা বিশ্লেশন করে দেখলেন যে , আমাদের এই মহাবিশ্বের একদম শেষ সিমানায় একধরণের মহাবৈশ্বিক সংঘর্ষের খুব ক্ষুদ্র আঘাতের চিহ্ন রয়েছে । তারা বিভিন্ন প্রযুক্তির মাদ্যমে এই ক্ষত স্থান গুলো চিহ্নিত করলেন । অবশেষে মাল্টিভার্স দাড়ানোর জন্য একটা ভিত পেলো ।

আসলে অন্য যে মহাবিশ্ব গুলো আছে সেগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সঠিকভাবে কোন কথা বলতে পারেন না । হয়ত সেখানে সবকিছু ভিন্ন । এমন কী পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলোও ।

এই হল মাল্টিভার্স থিওরীর মোটামুটি একটা ধারণা । আসলে এটা খুবই বিশাল একটা থিওরী । আমি চেষ্টা করেছি খুব ক্ষুদ্র ভাষায় এটা ব্যাখ্যা করার । সবাইকে এতবড় লেখাটা কষ্ট করে পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ।

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-১

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-২

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-৩

About The Author

Related posts

1 Comment

  1. Pingback: বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-১ – Star Barta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *