বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-৪

Share This Story !

প্রিয় স্টারবর্তার সকল পাঠকরা , আশা করি সবাই ভাল আছেন । আজ অনেক দিন পরে আমি আপনাদের মাঝে বিজ্ঞানের মহাজগৎ নিয়ে আবার হাজির হলাম । আমার আজকের আলোচনার বিষয় হল আমাদের এই মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ পরিণতি । কী হতে পারে আমাদের এই মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি , তা আমরা আজ এই লেখায় দেখব ।
গর্বের সাথে বলতে ইচ্ছা করছে যে , এই তত্ত্ব এর অন্যতম প্রবক্তা হলেন আমাদেরই একজন বিজ্ঞানী ” জামাল নজরুল ইসলাম ” স্যার ।

শুরুর কথা

এডুইন হাবলের ১৯২৯ সালের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পর থেকেই বিজ্ঞানীরা জানেন যে এই মহাবিশ্ব আসলে প্রতি মুহূর্তেই প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের এই মহাবিশ্ব কি ক্রমাগত এমনিভাবে প্রসারিত হতে থাকবে? নাকি মহাকর্ষের টান একসময় গ্যালাক্সিগুলির মধ্যকার প্রসারণের গতিকে মন্থর করে দেবে – যার ফলে এই প্রসারণ থেমে গিয়ে একদিন শুরু হবে সঙ্কোচন? এই প্রশ্নের উপরই কিন্তু আমাদের এই মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি নির্ভর করছে। প্রসারণ চলতেই থাকবে নাকি একসময় তা থেমে যাবে – এই ব্যাপারটি যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটির উপর নির্ভর করছে তা হল মহাবিশ্বের ‘ক্রান্তি ঘনত্ব’ (critical density); একে ‘সন্ধি-ঘনত্ব’ও বলতে পারি। এই সন্ধি বা ক্রান্তি ঘনত্বের বিষয়টি একটু পরিষ্কার করা যাক।

ধরা যাক, ভূপৃষ্ঠ থেকে একটি টেনিস বল মহাশূন্যে ছোঁড়া হল। এর পরিণতি কি হতে পারে? এক্ষেত্রে সম্ভাবনা দুটি। যদি ইনক্রিডিবল হাল্ক কিংবা বাঁটুল দি গ্রেটের মত কেউ বলটা ছোঁড়েন, আর বলের বেগ যদি কোনভাবে পৃথিবীর নিষ্ক্রমণ বা মুক্তি বেগেকে (escape velocity) ছাড়িয়ে যেতে পারে, তবে বলটা আর পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। আর আমার মত কমজোরি কেউ যদি বলটা ছোঁড়েন, তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায় যে বলটার বেগ নিষ্ক্রমণ বেগের চেয়ে অনেক কম হবে। সেক্ষেত্রে বলটা উপরে উঠতে উঠতে একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে মাধ্যাকর্ষণের টানে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে।
মহাবিশ্বের অবস্থাও আমাদের উদাহরণের ওই বলের মতন। এর কাছেও এখন দুটি পথ খোলা। এক হচ্ছে পালোয়ান হাল্ক বা বাঁটুলের ছুঁড়ে দেয়া বলের মতন সারা জীবন ধরে এমনিভাবে প্রসারিত হতে থাকা; এ ধরণের মহাবিশ্বের মডেলকে বলা হয় উন্মুক্ত বা সীমাহীন মহাবিশ্ব (unbounded universe or Open Universe)। অথবা আরেকটি সম্ভাবনা হল- মহাবিশ্বের প্রসারণ একসময় থেমে গিয়ে সঙ্কোচনে রূপ নেওয়া – এ ধরণের মহাবিশ্বকে বলে সংবৃত বা বদ্ধ মহাবিশ্ব (bounded universe or Closed Universe)। আর এই ঘটনা গুরৈার পেছনে দায়ী করা হয় মূলত ৩ টি জিনিস কে । সেগুলো হল :

ক. হাবলের ধ্রুবক (H): এ থেকে আমরা মহাবিশ্বের প্রসারণের হার সম্বন্ধে জানতে পারি।

খ. ওমেগা (Ω):এ থেকে আমরা মহাবিশ্বের পদার্থের গড় ঘনত্ব সম্বন্ধে ধারণা পাই।

গ. ল্যামডা (Λ): এটা শূন্যতার মধ্যে থাকা বিকর্ষণ শক্তি (কিংবা যা মহাবিশ্বকে ত্বরমাণ করে তুলছে।

প্রাথমিক ধারণা

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি নির্ভর করছে মহাবিশ্বের প্রকৃতি কি রকমের তার উপর। মহাবিশ্ব বদ্ধ হলে এর পরিণতি হবে এক রকমের, আর উন্মুক্ত হলে সেটা হবে আরেক রকমের। আজকের দিনের বিজ্ঞানীরা অবশ্য এ দুই সম্ভাবনার মাঝামাঝি আরেকটি সম্ভাবনাকেও হাতে রেখেছেন। এর নাম দেওয়া যাক- ‘বদ্ধ-প্রায় মহাবিশ্ব’ (marginally bounded universe)। চলতি কথায় একে সামতলিক মহাবিশ্ব বা ‘ফ্ল্যাট ইউনিভার্স’ নামেও অভিহিত করা হয়। স্ফীতি তত্ত্ব থেকে পাওয়া আধুনিক অনুসিদ্ধান্তগুলো এই সমতল মহাবিশ্বকে সমর্থন করে বলে পদার্থবিদদের বড় একটা অংশই এখন এই মহাবিশ্বের উপরই আস্থাশীল হয়ে উঠছেন। এই সমতল ধরণের মহাবিশ্ব সবসময়ই প্রসারিত হতে থাকবে ঠিকই, কিন্তু এক্কেবারে দেওয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে- অনেকটা পাশ-নম্বর পেয়ে কোন রকমে পাশ করে যেতে থাকা ছাত্রদের মতন। আমাদের বলের উদাহরণে ঠিক নিষ্ক্রমণ বেগের সমান (এর বেশীও নয়, কমও নয়) বেগ দিয়ে বলটিকে উৎক্ষেপণ করলে যে রকম অবস্থা হত, অনেকটা সেরকম। মহাবিশ্বের পরিণতির এই তিন ধরণের সম্ভাবনাকে নীচের ছবিতে দেখানো হয়েছে।

এখন কথা হচ্ছে, আমাদের মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কোন্ ধরণের পরিণতি ঘটতে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে কি ভাবে? এই লেখার শুরুতে যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটারের উল্লেখ করেছিলাম তার মধ্যে একটি হল ওমেগা (Ω), যা থেকে আমরা মহাবিশ্বের পদার্থের ঘনত্ব সম্বন্ধে ধারণা পাই। মহাবিশ্বের ঘনত্ব বলতে সমগ্র মহাবিশ্ব যে জড়পদার্থ দিয়ে তৈরি তার ঘনত্বের কথাই বলছি। পদার্থের পরিমাণ যত বেশী হবে মহাবিশ্বও তত ঘন হবে, আর সেই সাথে বাড়বে প্রসারণকে থামিয়ে দেওয়ার মত মহাকর্ষের শক্তিশালী টান। জিনিসটি বুঝতে আবার আমাদের আগেকার বলের উদাহরণে ফেরত যেতে হবে। বলের ওজন যত বেশী হবে মাধ্যাকর্ষণ পেরিয়ে নিষ্ক্রমণ বেগ অর্জন করতে তাকে তত বেশী কষ্ট করতে হবে।

মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও আমরা বলতে পারি, মহাবিশ্ব উচ্চ ঘনত্ব বিশিষ্ট হলে প্রসারণকে থামিয়ে দিয়ে সঙ্কোচনের দিকে ঠেলে দেওয়ার মত যথেষ্ট পদার্থ এতে থাকবে -ফলে মহাবিশ্ব হবে বদ্ধ (closed)। আর কম ঘনত্ব বিশিষ্ট মহাবিশ্ব সঙ্গত কারণেই হবে মুক্ত (Open)- যা প্রসারিত হতে থাকবে অনন্ত কাল ধরে। তাহলে এর মাঝামাঝি এমন একটা ঘনত্ব নিশ্চয়ই আছে যার উপরে গেলে মহাবিশ্ব একসময় আর প্রসারিত হবে না। সন্ধি বা ক্রান্তি ঘনত্ব (critical density) হচ্ছে সেই ঘনত্ব যার চেয়ে বেশি হলেই মহাবিশ্বের প্রসারণ থেমে গিয়ে তৈরি করবে সংকোচনের ক্ষেত্র। বিজ্ঞানীদের ধারণা এর মান প্রতি কিউবিক সেন্টিমিটারে ৪.৫ x ১০-৩০ গ্রাম থেকে ১৮ x ১০-২৯ গ্রামের মধ্যে বিচরণ করছে । মহাবিশ্বের প্রকৃত ঘনত্ব (actual density) আর ক্রান্তি ঘনত্বের (critical density) অনুপাতটিই হচ্ছে সেই ওমেগা (Ω), যাকে বিজ্ঞানীরা খুব গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। এই ওমেগার মান ১ এর কম (Ω ১)হলে মহাবিশ্ব হবে বদ্ধ বা সংবৃত। আর ওমেগার মান পুরোপুরি ১ (Ω = ১) হলে সেটা হবে সামতলিক মহাবিশ্ব। এখানে প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে যেতে যেতেও টায়ে টায়ে প্রসারিত হতে থাকবে শেষ পর্যন্ত, অনেকটা সেই কোন রকমে পাস মার্ক পেয়ে পাস করে যাওয়া ছাত্রের মতোই। কাজেই ১ হল ওমেগার সীমান্তিক মান।
এখন এই মহাবিশ্বের ঘনত্বের কথা বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয় । তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য কিছু কথা আমি এখন আপনাদের সামনে তুলে ধরব ।

মহাবিশ্বের ঘনত্ব

সম্ভাবনাগুলোর কথা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু মহাবিশ্বের আসল ঘনত্ব না জানলে তো বলা যাচ্ছে না ভবিষ্যতে আমাদের মহাবিশ্বের জন্য আসলে ঠিক কী অপেক্ষা করছে! তাহলে তো মহাবিশ্বের প্রকৃত ঘনত্ব জানতেই হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ঘনত্ব বের করার উপায় কি? একটা উপায় হল মহাশূন্যের সকল দৃশ্যমান গ্যালাক্সির ভর যোগ করে তাকে পর্যবেক্ষিত স্থানের আয়তন দিয়ে ভাগ করা। মহাবিশ্বের একটা গড় ঘনত্ব এভাবে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মুশকিল হল, এভাবে হিসেব করে ঘনত্বের যে মান পাওয়া গেছে তা খুব কম; সন্ধি ঘনত্বের শতকরা ১ ভাগ মাত্র। এর বাইরে গ্যাস ট্যাস মিলিয়ে অন্যান্য চেনা জানা পদার্থ গোনায় নিয়ে হিসেব করেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন সেটা শকরা ৪ ভাগের বেশি হয় না। অর্থাৎ আমাদের দৃশ্যমান যে জগত আমরা দেখি সেটা মহাবিশ্বের সামগ্রিক ভরের মাত্র ৪ ভাগ। তার মানে ঠিক কি দাঁড়ালো? দাঁড়ালো এই যে এই মান সঠিক হলে ওমেগার মান দাড়ায় ১ এর অনেক অনেক কম। তাহলে আমাদের সামনে চলে আসলো সেই উন্মুক্ত বা অনন্ত মহাবিশ্বের মডেল। তার মানে কি এই যে, মহাশূন্য কেবল প্রসারিত হতেই থাকবে?

কিন্তু সেরকমভাবে বলা যাচ্ছে না , কারণ এখানে বাধা দিয়েছে আরেক তত্ত্ব ।

ডার্ক ম্যাটার

এই মহাবিশ্বের একটা বড় অংশ, সত্য বলতে কি – মহাবিশ্বের প্রায় পুরোটাই – আমাদের চেনা জানা কোন পদার্থের অণু পরমাণু নয়, বরং অজ্ঞাত পদার্থ আর অজ্ঞাত শক্তিতে পরিপূর্ণ। আর বিজ্ঞানীদের এই নতুন আবিস্কারগুলো জন্ম দিয়েছে নানা আকর্ষণীয় সব গল্প কাহিনির। এখন আমরা এই জড় পদার্থ ও এর কেরামতি সমূহ জানব ।

বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ পেয়েছেন যে, আমাদের দৃশ্যমান পদার্থের বাইরেও মহাশূন্যে এক ধরণের রহস্যময় জড় পদার্থ রয়েছে যাকে বলা হয় গুপ্ত পদার্থ (Dark Matter)। এই অদৃশ্য জড়ের অস্তিত্ব শুধুমাত্র গ্যালাক্সির মধ্যে মহাকর্ষের প্রভাব থেকেই জানা গিয়েছে, কোন প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে নয়। বিজ্ঞানের জগতে এমন অনেক কিছুই আছে যা প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গৃহীত হয় নি, হয়েছে পরবর্তীকালে পরোক্ষ প্রমাণ, অনুসিদ্ধান্ত কিংবা ফলাফল থেকে। তবে তাই বলে সেগুলি বিজ্ঞান-বিরোধীও নয়। যেমন, মহাবিস্ফোরণ বা বিগ-ব্যাং এর ধারণা। কেউ চোখের সামনে এটি ঘটতে দেখেনি। কিন্তু মহাজাগতিক পশ্চাৎপট বিকিরণ বা কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনসহ অন্যান্য অসংখ্য পরোক্ষ প্রমাণ কিন্তু ঠিকই মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বকে বিজ্ঞানের জগতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এমনি আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে বিবর্তনবাদ – যার চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া অসম্ভব হলেও অসংখ্য পরোক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতেই বিভিন্ন ধরণের বিশ্বাস-নির্ভর সৃষ্টিতত্ত্বকে হটিয়ে তা বিজ্ঞানের জগতে জায়গা করে নিয়েছে।

আমাদের গ্যালাক্সি কেন্দ্র থেকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্ররাজির গতিবেগ কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত নক্ষত্ররাজির বেগের তুলনায় কম হওয়ার কথা; ঠিক যেমনটা ঘটে আমাদের সৌরজগতের ক্ষেত্রে। সূর্য থেকে যত দূরে যাওয়া যায়- গ্রহগুলোর গতিবেগও সেই হারে কমতে থাকে। কারণটা খুবই সোজা। নিউটনের সূত্র থেকে আমরা জেনেছি যে, মাধ্যাকর্ষণ বলের মান দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ দূরত্ব বাড়লে আকর্ষণ বলের মান কমবে তার বর্গের অনুপাতে। টান কম হওয়ার জন্য দূরবর্তী গ্রহগুলো আস্তে চলে। আমাদের ছায়াপথের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটবার কথা। কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী নক্ষত্রগুলো তাদের কক্ষপথে কেন্দ্রের কাছাকাছি নক্ষত্রগুলোর চেয়ে আস্তে ঘুরবার কথা। কিন্তু এ বিষয়ে গবেষনা করে বিজ্ঞানী রুবিন যে ফলাফল পেলেন তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। দূরবর্তী নক্ষত্রগুলির ক্ষেত্রে গতিবেগ কম পাওয়া তো গেলই না বরং একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের পর সকল নক্ষত্রের বেগ প্রায় একই সমান পাওয়া গেল। অন্যান্য সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলি (যেমন অ্যাণ্ডোমিডা) পর্যবেক্ষণ করেও রুবিন সেই একই ধরণের ফলাফল পেলেন। তার এই পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিদদের ভাবনায় ফেলল । হয় রুবিন কোথাও ভুল করেছেন, অথবা এই গ্যালাক্সির প্রায় পুরোটাই এক অজ্ঞাত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জড়পদার্থে পূর্ণ । রুবিন যে ভুল করছেন না এই ব্যাপারটা আরও ভালোভাবে বুঝা গেল অ্যাড্রোমিণ্ডা গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করে। দেখা গেল ২২ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের এই গ্যালাক্সিটি ঘণ্টায় প্রায় ২ লক্ষ মাইল বেগে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। এই অস্বাভাবিক গতিবেগকে মহাকর্ষ জনিত আকর্ষণ দিয়েই কেবলমাত্র ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু দৃশ্যমান জড়পদার্থ তো পরিমাণে অনেক কম ফলে মহাকর্ষের টান তো এত ব্যাপক হবার কথা নয় ! তাহলে? তাহলে কোথাও নিশ্চয়ই বিশাল আকারের অদৃশ্য জড়পদার্থ এই দুই গ্যালাক্সির মাঝে লুকিয়ে আছে। বিশাল আকার বললাম বটে, তবে সেটা যে কতটা বিশাল তা বোধ হয় অনুমান করা যাচ্ছে না। এই অদৃশ্য পদার্থের আকার আমাদের যে ছায়াপথ সেই ‘মিল্কিওয়ে’-এর মোটামুটি দশ গুণ! আজকের দিনের বিজ্ঞানীরা বহুভাবে ফ্রিৎস জুইস্কি কিংবা ভেরা রুবিনের কাজের সত্যতা নির্ণয় করেছেন। ছায়াপথের ঘূর্ণন কার্ভ, ক্লাস্টার নিয়ে গবেষণা, মহাজাগতিক কাঠামোর সিমুলেশন, মহাকর্ষীয় লেন্সিং সহ বহু ক্ষেত্রেই এই গুপ্ত পদার্থের হদিসের ব্যাপারটা বিজ্ঞানীদের কাছে প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে।

অদৃশ্য গুপ্ত জড়পদার্থ আছে – তা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু কেমনতর এই জড়পদার্থ গুলো? এদের বৈশিষ্ট্যই বা কি রকম? সত্যি বলতে কি – আমরা এখনও তা বুঝে উঠতে পারিনি। গুপ্ত পদার্থে নিশ্চিতভাবে কোন ঝলমলে নক্ষত্র নেই – থাকলে তো আর তারা অদৃশ্য থাকত না। এতে ধূলি কণাও থাকতে পারে না – কেন না এই ধূলি কণাগুলি দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলো’কে আটকে দেবার জন্য এবং সেই সাথে আমাদের চোখে ধরা পড়বার জন্য যথেষ্টই বড়। তা হলে কি আছে এতে? আসলে বিজ্ঞানীরা যে তত্ত্ব দিয়েছেন তা যদি সত্যি হয়ে থাকে, গুপ্ত জড় বস্তুসমূহ আমাদের চেনা জানা কোন পদার্থ দিয়েই তৈরি হওয়ার কথা নয়। সে জন্যই তারা রহস্যময় এবং গুপ্ত। অনেকে বলছেন এরা তৈরি হয়েছে নিউট্রিনো কণিকাপুঞ্জ দিয়ে। কিন্তু সম্প্রতি মেক্সিকান পদার্থবিজ্ঞানী কার্লোস ফ্র্যাঙ্ক কম্পিউটারে সিমুলেশন করে দেখিয়েছেন যে শুধুমাত্র নিউট্রিনোকে ধরে হিসেব করলে আসলে এই অন্ধকার জড়ের সঠিক ব্যাখ্যা মেলে না ।কাজেই এই সব নিউট্রিনোর বাইরেও বিশাল ভরের অজানা কণিকার অস্তিত্ব আছে যেগুলো মহাবিশ্বের সামগ্রিক গঠনে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ডার্ক ম্যাটারকে ব্যাখ্যার জন্য বেশ কিছু নতুন ধারণা প্রস্তাব করা হয়েছে। এদের মধ্যে অগ্রগামী প্রার্থী হচ্ছে WIMPs – এরা দুর্বল মিথস্ক্রিয়াসম্পন্ন (কল্পিত) ভারী কণা । এদের নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক তত্ত্ব আছে। ধারণা করা হয় এদের উদ্ভব ঘটেছিল বিশেষ ধরণের প্রতিসাম্যতার ভাঙ্গনের মধ্যে দিয়ে, এবং এদের ভর প্রায় ১০০ জিইভির কাছাকাছি। এর বাইরেও বিজ্ঞানীদের তালিকায় আছে নিউট্রালিনো, হিগসিনো, স্টেরাইল নিউট্রিনো এবং এক্সিয়ন । বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন যতদূর সম্ভব এদের সম্বন্ধে জেনে সঠিক ধারণায় পৌঁছুতে কারণ মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থার সাথে ডার্ক ম্যাটারের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। আরেকটি কারণেও ডার্ক ম্যাটার গুরুত্বপূর্ণ। সেই ওমেগার ব্যাপারটি। যদিও বর্তমানে বিজ্ঞানীদের ধারনা গুপ্ত পদার্থ মহাবিশ্বের মোট ভরের ২৩ ভাগের বেশি নয়; কিন্তু মহাবিশ্বের উদ্ভবের সময়গুলোতে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ পদার্থই ছিল এ ধরণের অদৃশ্য জড়। সেরকম কিছু অদৃশ্য পদার্থ যদি এখনো থেকে থাকে, তবে মহাশূন্যের বিশাল এলাকা যাদের আমরা শূন্য বলে ভাবছি, সেগুলো সেই অর্থে ‘শূন্য’ নয়; মহাবিশ্ব আসলে হতে পারে এই অদৃশ্য গুপ্ত জড়পদার্থের এক অথই মহাসমুদ্র – আর দৃশ্যমান জড়পিণ্ড গুলি হচ্ছে তার মাঝে নগণ্য কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আলোকিত ‘দ্বীপপুঞ্জ’। এই ব্যাপারটা সত্য হলে কিন্তু ওমেগার মান ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যেতে পারে । সে ক্ষেত্রে এক সময় মহাবিশ্বের প্রসারণ বন্ধ হয়ে শুরু হয়ে যেতে পারে সঙ্কোচনের পালা বদল।

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি ব্যাখ্যা

মহাবিশ্ব সঙ্কুচিত হতে থাকলে কি হবে ? যখন সঙ্কোচনের পালা আসবে, আশেপাশের গ্যালাক্সির দিকে তাকালে তখন আর লোহিত ভ্রংশ (Red Shift) দেখা যাবে না, তার বদলে দেখা যাবে নীলাভ ভ্রংশ (Blue Shift)। নিজেদের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়তে থাকায় পদার্থের ঘনত্ব, আর তাপমাত্রা ক্রমশ: বাড়তে থাকবে। তারপর যে সময় ধরে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছিল, সেই একই কিংবা কাছাকাছি সময় ধরে মহাবিশ্ব সংকুচিত হয়ে আবারো সেই প্রাথমিক অবস্থায় ফিরে যাবে, যেখান থেকে এক সময় বিগ ব্যাং এর সূচনা হয়েছিল! মহাবিশ্বের এই অন্তিম পতনের নাম দেওয়া হয়েছে মহাশাব্দিক সঙ্কোচন (Big Crunch)। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন মহা বিস্ফোরণ আর মহা সঙ্কোচনের মাঝে আজীবন দুলতে থাকাও মহাবিশ্বের পক্ষে অসম্ভব নয়। বরং এই মহাবিশ্ব হতে পারে দোদুল্যমান (Oscillating)। যেমন, এ কালের খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং একটা সময় এমন একটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন- এই দোদুল্যমান মহাবিশ্বকে (Oscillating universe) যে অদ্বৈত বিন্দু থেকেই শুরু করতে বা এতে গিয়ে শেষ হতে হবে -এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। সঙ্কুচিত হতে হতে অন্তিম পতনের আগ মুহূর্তে কোন এক ভাবে যথেষ্ট পরিমাণ চাপ সৃষ্টি হয়ে মহাকর্ষের টানকে অতিক্রম করবার মত যথেষ্ট শক্তি অর্জিত হবে- যা ধাক্কা দিয়ে মহাবিশ্বকে আরেকটি প্রসারণের চক্রে ঠেলে দিতে পারে। এর তাৎপর্য হল মহাবিশ্বের চরম পতন জাতীয় অদ্বৈত বিন্দুতে পরিসমাপ্তি ঘটবে না – বরং প্রবলভাবে ’প্রত্যাবৃত্ত’ হবে অর্থাৎ ইংরাজিতে যাকে বলে ‘বাউন্স’ করবে । সৃষ্টি ও ধ্বংসের এই দুটি অদ্বৈত বিন্দুর মধ্যে মহাবিশ্বের এ ধরণের সৃষ্টি-লয়ের ‘স্পন্দনময় গমনাগমন’ হয়ত চলতে থাকবে অন্তহীনভাবে । নিচের চিত্র টা দেখুন । বিষয়টা ক্লিয়ার হবে ।

তাহলে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলির সারমর্ম হল, মহাবিশ্বে এক ধরণের শক্তি আছে যার উৎস ‘এখনও অজানা’। এটার উৎস হতে পারে স্রেফ ভ্যাকুয়াম শক্তি, কিংবা হতে পারে কুইন্টেসেন্সের মত কিছু । জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটা বড় কাজ এই মুহূর্তে এই গুপ্ত শক্তির সঠিক প্রকৃতি কিরকমের তা নির্ণয় করা – এটা কি কুইন্টেসেন্স এর মত ‘গতিময়’ নাকি ভ্যাকুয়াম শক্তির মত ‘স্থির’? এ ব্যাপারটা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কিন্তু যেটা তারা জানেন তা হল – এই শক্তি বিকর্ষণমূলক । ফলে এই শক্তি মহাবিশ্বকে সীমিত রাখতে সহায়তা করছে না, বরং প্রসারণের হার ক্রমশঃ বাড়িয়ে তুলছে । প্রসারণের হার যদি এমনভাবে বাড়তে থাকে তাহলে শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্বের পরিণতি কি হবে? প্রসারণ যদি বাড়তেই থাকে তাহলে গ্যালাক্সিগুলি পরস্পর থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাবে- আর আলোর উৎসগুলো (বিপুল নক্ষত্ররাজি) শক্তিক্ষয় করে একসময় অন্ধকারে ডুবে যাবে; অর্থাৎ মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ আক্ষরিক অর্থেই অন্ধকার! আমরা উপরে ‘অবস্থা-সমীকরণ চলক’ এর যে হিসেব দিয়েছি, সেখানে w এর মান -১ এর কাছাকাছি (অর্থাৎ গুপ্তশক্তির পুরোটাই অপরিবর্ত ভ্যাকুয়াম শক্তিবিশিষ্ট) হলে এমন অবস্থা হবে । আমাদের আজকের যে মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ তা এ ধরণের পরিণতির দিকেই রায় দেয়। এই পরিণতি সত্য হলে, আজ থেকে এক থেকে দুই ট্রিলিয়ন বছরের মধ্যে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথ ছাড়া আর কোন ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করতে পারব না । আর শেষ পর্যন্ত সমস্ত মহাবিশ্বের নক্ষত্ররাজি পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে । মহাশূন্য চলে যাবে অন্ধকার আর শৈত্যময় এক নির্জীব অবস্থায়[ ।বিজ্ঞানীরা এই পরিণতির নাম দিয়েছেন মহাশৈত্য বা ‘বিগ চিল’ (Big Chill) ।

সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে বছর কয়েক আগে উঠে এসেছে আরেকটি নতুন মতবাদ। যদি w এর মান -১ এর চেয়ে আরো কম হয়, মানে অধিকতর ঋণাত্মক (যেমন w = – 1.15), তাহলে তা তৈরি করবে আরেক ধরণের চরম পরিণতির ক্ষেত্র। গুপ্তশক্তির প্রভাব সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকবে। প্রসারণ বাড়তে থাকবে অচিন্তনীয় ভাবে। ডার্টমাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কাল্ডওয়েল মনে করেন যে, দুই হাজার কোটি বছরের মধ্যে প্রসারণ এতই বেড়ে যাবে যে, এই বহির্মুখী প্রসারণ-চাপ আক্ষরিক অর্থেই গ্যালাক্সিগুলিকে একসময় ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে; ছিঁড়ে ফেলবে নক্ষত্রকে, ছিঁড়ে ফেলবে গ্রহদের, ছিঁড়ে ফেলবে আমাদের সৌরজগৎকে আর শেষ পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলবে সকল শ্রেণীর জড় পদার্থকে। এমনকি পরমাণু পর্যন্ত ছিঁড়ে যাবে অন্তিম সময়ের ১০^-১৯ সেকেন্ড আগে ।এই মতবাদকে নামাঙ্কিত করা হয়েছে বিগ রিপ (Big Rip) বা ‘মহাচ্ছেদন’ অভিধায়। তবে এই মহাচ্ছেদন সত্যই ঘটবে কিনা -শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ গবেষণা থেকেই তা সঠিকভাবে জানা সম্ভব। অনেকেই মনে করেন, এখনকার পর্যবেক্ষণ যা থেকে গুপ্ত শক্তি আইনস্টাইনের মহাজাগতিক ধ্রুবকের সমতুল মনে মনে করা হচ্ছে, সেটা সঠিক হলে বিজ্ঞানীদের ‘বিগ রিপ’ নিয়ে এতটা চিন্তিত না হলেও চলবে।

‘বিগ চিল’ আর ‘বিগ রিপের’ বাইরেও আরেকটি সম্ভাবনা আছে। এটার কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। সেই ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ বা মহাসঙ্কোচন। যদিও এই মুহূর্তে গুপ্ত শক্তির যে হাল হকিকত, তাতে করে মহাসংকোচন বা বিগ ক্রাঞ্চ ঘটার সম্ভাবনা খুব কম বলেই বিজ্ঞানীরা মনে করেন। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে গুপ্তশক্তি পাওয়া যাবার আগ পর্যন্ত মহাসংকোচনের ব্যাপারটা একটা জোরালো সম্ভাবনা হিসেবেই বিজ্ঞানীদের তালিকায় ছিল। কিন্তু বিকর্ষণমূলক গুপ্ত শক্তির আগমনে দাবার ছক মোটামুটি উল্টে গেছে। গুপ্ত শক্তি ব্যাপারটা এখন এতোটাই প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করছে যে, সবাই এখন মহাবিশ্বের প্রসারণ জনিত মৃত্যু দূত মহাশৈত্য আর মহাচ্ছেদন নিয়েই ভাবিত। মহাসংকোচন ক্রমশঃ হারিয়েই যাচ্ছে বিস্মৃতির অন্তরালে। তারপরেও কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে সেটার সম্ভাবনা ফিরেও আসতে পারে। যদি w এর মান -১ এর চেয়ে বেশি হয়, মানে কম ঋণাত্মক (যেমন w = – 0.85 বা এ ধরণের কিছু),তাহলে মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে হতে একসময় হয়তো আগের মতোই মহাশৈত্য বা ‘বিগ চিল’ -এ এসে শেষ হবে। কিন্তু এমনও হতে পারে একটা সময় পর এই গুপ্ত শক্তিজনিত প্রসারণ ধীর হয়ে থেমে গেল, আর পুনরায় শুরু হল চিরচেনা পদার্থের রাজত্ব। এখন নিচের চিত্রটা লক্ষ্য করুন :

যাই হোক , এসব নিয়ে আপনাদের এত দ্রুত ভাবনার দরকার নেই । কারণ , এসব ঘটনা ঘটবার এখনও বহুত দেরী । তখন হয়ত এই পৃথিবীতে মানুষেরই অস্তিত্ব থাকল না ।

সূত্র:

অভিজিৎ রায়ের রচিত ৩ টি বই :
১. আলো হাতে চলিয়াছে আধারের যাত্রি ।
২. শূণ্য থেকে মহাবিশ্ব ।
৩. অসম্ভবের বিজ্ঞান ।

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-১

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-২

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-৩

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-৪

বিজ্ঞানের মহাজগৎ! পর্ব-৫

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *