বেজি ও গুপ্তধনের গল্প

Share This Story !

সাবু দর্জিকে এলাকার সবাই চেনে। তার হাতের কাজ চমৎকার। সে একটা বেজি পোষে এ কথাও কারো অজানা নয়। যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে যায়। হঠাৎ করেই একদিন তার বাড়িতে দালান উঠলো। সবাই বললো, সাবু দর্জি এতো টাকা পেলো কোথায়। কেউ কেউ প্রশ্ন করলো তুমি বাড়িতে দালান দিলে, টাকা পেলে কোথায়? সাবু দর্জির এক কথা- টাকা ঘরেই ছিলো। তা ছাড়া শ্বশুর বাড়ি থেকে হেল্প করেছে। আসল কথা কাউকে সে বললো না। আসল ঘটনা সে আর তার বেজিটাই জানে। কিন্তু বেজিটাতো কথা বলতে পারে না তাই কথাটা কেউ আর জানতে পারলো না।
একদিন এক লোক কদবেল নিয়ে এলো বাজারে। দর্জি ছেলে-মেয়েদের জন্য দুটো কদবেল কিনতে গেলো। কিন্তু দামে পটলো না বলে কদবেল আর কেনা হলো না। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো মাঝি পাড়ার নিশি কান্ত। সে বললো, গড়াই নদীর ভাঙনে বাঁশঝাড়ের মধ্যে একটা কদবেল গাছ আছে। পাকা কদবেল তলায় পড়ে থাকে কেউ নিতে যায় না।
দর্জি বললো, কেউ নেয় না কেন?
– ওখানে অনেক বড় একটা সাপ আছে। তা ছাড়া ও পাড়ার সবাই চলে গেছে দূরে। প্রতি বছর নদীর পাড় ভাঙে, বাঁশঝাড়ও কবে ভেঙে পড়বে।
দর্জি কিছু না বলে সেখান থেকে চলে এলো। পরদিন সে আর বাজারে কাজ করতে গেলো না। বেজি আর ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে গেলো সেই বাঁশ বাগানে। হাতে একটা লাঠি। ছেলের হাতে একটা বেতের কাঠা। সাবু দর্জি বেজিটাকে লেলিয়ে দিল কদবেল গাছের দিকে। বেজিটা লেজ ফুলিয়ে মাটি শুঁকতে শুঁকতে চলে গেলো কদবেল গাছের গোড়ায়। একহাত দূরেই একটা গর্ত দেখে বেজিটা দু’হাতে মাটি খুঁড়তে শুরু করলো। বুঝা গেলো ওখানে ঠিকই সাপ আছে। দর্জি দূর থেকে দু’তিনটা কদবেল কুড়িয়ে ছেলের দিকে ছুড়ে দিলো। নিরাপদ জায়গায় বসে আছে ছেলেটা।
এর মধ্যেই সাপের ফোঁস-ফোঁস কানে এলো দর্জির। সাপ উঠে এলো ওপরে। বিরাট সাপ। দেড়হাত খাড়া হয়ে ফণা তুলে দাঁড়ালো সাপটা। বেজিটা সমস্ত শরীর ফুলিয়ে সাপের চার দিকে ঘুরতে লাগলো। দর্জির মনে হলো সাপটাই বুঝি বেজিটাকে গিলে খেয়ে ফেলে। এখন সে কী করবে। বাঁশ বাগানের মধ্যে ছায়া ঢাকা পায়ে চলা পথ। সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে একটা কাটা বাঁশ পেয়ে গেলো। পাঁচ-ছয় হাত লম্বা। বাঁশটা হাতে নিয়ে সে বাঁশঝাড়ে উঠে গেলো। এ বাঁশ সে-বাঁশ করে সাপটার কাছাকাছি গেলো। আস্তে আস্তে বাঁশের এক মাথা ঝপ করে ফেলে চেপে ধরে রাখলো সাপটাকে। এই সুযোগে বেজিটা লাফ দিয়ে ধরে ফেললো সাপের মাথাটা। সাপও শরীর বাঁকালো কিন্তু বেজিটা এদিক সেদিক ঘুরলো বটে কিন্তু সাপের মাথাটা ছাড়লো না। প্রায় পনেরো মিনিট পর সাপটা ক্লান্ত হয়ে পড়লো। বেজিটা সাপটাকে টেনে নিয়ে গেলো একটু দূরে।
দর্জি ওপর থেকে নামতে গিয়ে দেখে আরেকটি সাপ গর্ত থেকে ওপরে উঠে আসছে। তখন সে আবার শিস বাজালো। বেজিটা ফিরে এসে সাপ দেখে আবার লেজ ফুলিয়ে সাপের চার দিকে ঘুরতে লাগলো। দর্জি আবার একটু ওপরে উঠে গেলো আর আগের মতো বাঁশের এক প্রান্ত সাপের শরীরের ওপর এক ঘা মেরে ঠেসে ধরে রাখলো। সাপটা ঘাড় বাঁকা করে বাঁশটা পেঁচিয়ে ধরলো। ঠিক সেই সময় বেজিটা ধরে ফেললো সাপের মাথাটা। এভাবেই দুটো সাপ মারলো বেজিটা। 
এবার দর্জি নেমে এলো বাঁশঝাড় থেকে। গর্তে আরো সাপ আছে কিনা দেখার জন্য হাতের লাঠি দিয়ে খুঁচাতে লাগলো। কিন্তু সাপের কোনো সাড়া শব্দ পেলো না। তবে খট করে একটা শব্দ হলো। দর্জির সন্দেহ হলো ওখানে কিছু একটা আছে। তখন কবি নজরুল ইসলামের সেই সাপ আর টাকার কলসের কথা মনে পড়লো। শেষে কিছু কদবেল আর বেজি নিয়ে সে ফিরে এলো বাড়িতে। 
রাতে স্বপ্নে দেখলো স্বর্ণ আর কাঁচা টাকা সে গুনছে। গুনতে গুনতে তার ঘুম ভেঙে গেলো। সকালে কাউকে কিছু না বলে একটা ছোট্ট কোদাল হাতে দর্জি চলে গেলো সেই বাঁশ বাগানে।
চারদিকটা দেখে-শুনে গর্তের মাটি খুঁড়তে লাগলো। প্রায় দু’হাত নিচে পাওয়া গেলো একটা পিতলের ঘড়া। দেখেই আনন্দে মনটা নেচে উঠলো তার। তবে বুকের মধ্যে কেমন ধুক-ধুক শুরু হলো। শেষে ভাঙন বেয়ে নদীতে নেমে মাটি কাদা ধুয়ে ঘড়াটা তুলে আনলো ওপরে।
দর্জি ভাবলো এভাবে ঘড়াটা বাড়ি নেওয়া যাবে না। কারণ পথে লোকজন প্রশ্ন করবে ঘড়া পেলে কোথায়? ওর মধ্যে কী আছে- আসল কথা লোকে সন্দেহ করবে। এসব ভেবে ভাঙনের ভাটফুলের গাছের মধ্যে লুকিয়ে রেখে বাড়িতে এলো।
বৌ বললো, এতো সকালে কোথায় গিছলে? সাবু দর্জি কোনো কথা বললো না। তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো? কারো সাথে ঝগড়া করেছো নাকি।
– কী আজেবাজে কথা বলছো। পানি দাও, খুব পিপাসা লেগেছে।
– তা দিচ্ছি-আজ বাজারে যাবে না?
– না। একটা ছেঁড়া কাপড় খুঁজে রেখে দিও।
– ছেঁড়া কাপড় দিয়ে কী হবে।
– এতো কথা বলো কেনো। সন্ধ্যায় নদীতে যাবো বালু আনতে।
– বালু আনতে সন্ধ্যায় যাবে কেনো? শ্মশান ঘাটে কতো কিছু থাকে- যদি তোমার কোনো বিপদ হয়!
– চুপ করো। আর একটি কথাও বলবে না। ভাত বাড়ো, আমি গোসল করে আসি।

বেজি ও গুপ্তধনের গল্প । দেলোয়ার হোসেন

সেদিন ছিলো হাট বার। বিকেলের দিকেই ছেঁড়া কাপড়খানা বগলদাবা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো দর্জি। চরের ওপর কিছুক্ষণ ঘুরলো। তারপর সূর্য ডুবলে সেই ভাটি গাছের ভিতর থেকে ঘড়াটা বের করে ছেঁড়া কাপড় প্যাঁচিয়ে সে ঘড়াটা মাথায় করলো। তখন ছায়া ছায়া অন্ধকার নেমেছে পথে। দু’ একজন লোকের সাথে দেখাও হলো। কেউ কিছু বললো না। হঠাৎ একজন বললো দর্জির মাথায় কী? আজ বাজারে যাওনি।
দর্জি বললো, বাজারে যাইনি। সারা চর ঘুরে ঘুরে মোটা বালু নিয়ে এলাম। বৌ মুড়ি ভাজবে। বাড়ি এসে ঘড়াটা চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখলো। বৌ এসে হাসতে হাসতে বললো কী আনলে। দর্জি চোখ বড় বড় করে বললো, একদম চুপ। ফ্যাচ ফ্যাচ করলে আমরা বিপদে পড়বো। যা বলার রাতে বলবো।
রাতে ছেলে-মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লে দর্জি সেই ঘড়াটা ঘরের মেঝেয় আনলো। ঘড়ার মুখটা বন্ধ। বৌকে বললো, একটা দা নিয়ে আসো। এর মধ্যে যদি সোনা রূপা থাকে তা’হলে আমাদের আর চিন্তা থাকবে না। মুখের ঢাকনাটা এক প্রকার আঠা দিয়ে আটকানো। দা-এর মাথা দিয়ে খোলা সম্ভব হলো না।
হঠাৎ দর্জি কী মনে করে পাটকাঠিতে আগুন জ্বেলে ঘড়ার মুখের চার দিকে ঘুরালো। তাতে আঠা একটু নরম হলো তখন দা-য়ের মাথা দিয়ে চাড় দিতেই চড় চড় করে খুলে গেলো ঢাকনা। ভিতরে তাকিয়ে সাবু দর্জিতো জ্ঞান হারাবার অবস্থা। ঘড়ায় ভরা আগেকার রূপার টাকা।
বৌ বললো, পানি খাও। বেশি উতলা হইও না। এখন চিন্তা করো কিভাবে এগুলো বিক্রি করা যায়। দর্জি ঘড়া থেকে বিশ টাকা তুলে ঘড়াটা আবার রেখে দিলো আড়ালে। পরদিন ঘাড়ে ঝুলানো ব্যাগের মধ্যে সেগুলো নিয়ে শহরে চলে গেলো। 
শহরে সেকরার দোকানে খোঁজ খবর করলো, কেউ টাকা নেড়ে চেড়ে দেখলো। অনেক পুরনো টাকা মূল্যও বেশি। দশ দোকান দেখে সেগুলো বিক্রি করলো। অনেকে জানতে চাইলো এগুলো কোথায় পেয়েছেন? দর্জি বললো, বাড়িতে গর্ত খুঁড়তে গিয়ে পেয়েছি। 
টাকা পয়সা নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসলেই এক লোক এসে বললো, আপনাকে ঠকিয়েছে। এই টাকার মূল্য অনেক। আরো থাকলে আমাকে দিতে পারেনÑ অনেক বেশি টাকা পাবেন।
লোকটা একদিন বাড়িতে এলো আর একশতটি রূপার টাকা নিয়ে গেলো। এভাবেই সবটাকা বিক্রি হয়ে গেলো। একদিন দর্জি বাজার থেকে রড সিমেন্ট নিয়ে এলো আর দালান গাঁথা শুরু করে দিলো।
এই টাকা ছিলো সহাদেব মণ্ডলের দাদার। সেই আমলে জলদস্যুরা বড় বড় বাড়ি দেখে ডাকাতি করতো। ওদের হাত থেকে টাকা-পয়সা রক্ষা করার জন্য লোকেরা এভাবেই সে সব মাটির নিচে পুঁতে রাখতো। যাই হোক, সেই টাকা দিয়ে দালান হলো, বাজারে দোকান হলো, বৌ-এর গা ভরা গয়নাও হলো।
তবে দেখতে দেখতে বেজিটার আদর গেলো কমে। একদিন বেজিটাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। এখনো সাবু দর্জি জনে জনে পাগলের মতো জিজ্ঞাসা করে বেড়ায় তোমরা আমার বেজিটাকে দেখেছো? তখন লোকজন আন্দাজ করলো- বেজিটার কারণেই হয়তো সে কোনো গুপ্তধন পেয়েছিলো, তাই বেজিটার জন্য এখন পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *